বৃহস্পতিবার, ২৬ মে ২০২২, ১২:০১ অপরাহ্ন

অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে কমলনগরের প্রথম শহীদ মিনার

নিজস্ব প্রতিবেদক : লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার প্রথম নির্মিত শহীদ মিনারটি দীর্ঘ এক যুগ ধরে চরম অযত্ন ও অবহেলায় পড়ে আছে। ১৯৭২ সালে উপজেলা সদর হাজিরহাট ইউনিয়ন পরিষদের সামনে নির্মিত এ শহীদ মিনারটির প্রবেশপথ বন্ধ থাকায় দীর্ঘদিন যাবত এই শহীদ মিনারে শহীদদের স্মরণে ফুল দেওয়া হয় না। এমনকী শহীদ মিনারটির সামনেই নির্মাণ করা হয়েছে সেপটিক ট্যাংক। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলে আসলেও এর সমাধানে কেউ এগিয়ে আসেনি। শহীদ মিনারটির মর্যাদা রক্ষায় এর সংস্কার, সংরক্ষণ বা স্থানান্তরের উদ্যোগ নেয়নি কেউ।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৭১ সালের ১৯ ডিসেম্বর এ এলাকা শত্রুমুক্ত হওয়ার পর স্থানীয় কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার নেতৃত্বে একদল যুবক একটি শহীদ মিনার নির্মাণের উদ্যোগ নেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসে তারা নিজেদের অর্থে হাজিরহাট ইউনিয়ন পরিষদের সামনে একটি শহীদ মিনার নির্মাণ করেন। এটিই বর্তমান কমলনগর উপজেলা এলাকার প্রথম নির্মিত শহীদ মিনার। শহীদ মিনারে দুইটি স্তম্ভের একটির রং কালো; যাতে পাঁচটি ক্ষত চিহ্ন রয়েছে। এটি দিয়ে বাঙালির অর্জনের পাঁচটি ধাপ (১৯৫২, ১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৬৯ এবং ১৯৭১ সাল) বুঝানো হয়েছে। অপর স্তম্ভে রয়েছে লাল-সাদা ও পাথরের ধাপ। যা দিয়ে বাঙালির বিভিন্ন সংগ্রামের পরিক্রমা বুঝানো হয়। এর ওপরে রয়েছে উদীয়মান লাল সূর্য।
জানা গেছে, তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র বর্তমান সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী খায়ের এজাজ মাসুদ নিশাদ, বীর মুুক্তিযোদ্ধা আবু নুর সেলিম, আবুল বারাকাত দুলাল, খায়ের ইমতিয়াজ মাসুদ দাউদ, প্রয়াত আব্দুল হাদী মাস্টার ও ব্যবসায়ী বিনোদ বিহারীসহ কয়েকজন যুবক শহীদ মিনারটি নির্মাণ করেছেন।
স্থানীয়রা জানান, উপজেলার প্রথম নির্মিত এ শহীদ মিনারে এলাকাবাসী মহান ভাষা দিবসসহ বিভিন্ন জাতীয় দিবসে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করে আসছিলেন। কিন্তু ২০০৮ সালের দিকে হঠাৎ করে শহীদ মিনারটির প্রবেশ পথ বন্ধ করে পাকা মহিলা মার্কেট নির্মাণ করা হয়। আর মিনারের সামনে স্থাপন করা হয় মার্কেটের টয়লেটের টাংকি (সেপটিক ট্যাংক)। এতে করে প্রবেশ পথ না থাকায় শহীদ মিনারটি মার্কেটের পাকা ভবনের আড়ালে পড়ে যায়। এরপর থেকে শহীদ মিনারটিতে ফুল দেওয়া বন্ধ হয়ে যায় ও শহীদ মিনারটি অযত্ন ও অবহেলায় পরিত্যাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে। তাই, ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে এটির দ্রুত সংস্কার করা জরুরি বলে তারা জানান।
এদিকে শহীদ মিনারটিকে অবমাননা করে নির্মিত মহিলা মার্কেটটিও কোনো কাজে আসছে না। নির্মাণের পর থেকে একবারের জন্যও এটি চালু না হওয়ায় পড়ে রয়েছে পরিত্যাক্ত অবস্থায়।
শহীদ নিমারটির নির্মাণের উদ্যোক্তাদের একজন উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু নুর সেলিম জানান, তারা কয়েকজন যুবক মিলে নিজের অর্থ খরচসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে ইট, বালু ও সিমেন্ট সংগ্রহ করে শহীদ মিনারটি নির্মাণ করেছেন। শহীদ মিনার বানিয়ে ভাষা শহীদদের স্মরণ করে গাঁদা ফুলের মালা গেঁথে পুষ্পস্তবক অর্পনের মধ্য দিয়ে ১৯৭২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি এ অঞ্চলে তারা প্রথম শহীদ দিবস পালন করেছিলেন। এটিই ছিল এ উপজলার প্রথম শহীদ মিনার ও শহীদ দিবস পালন। কিন্তু এমন ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এ শহীদ মিনারটি এখন অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে। এখন আর কেউ মিনারটিতে ফুল দিতে যায় না। এসব কারণে অনেকেই জানেন না যে, এ মিনারটিই উপজেলার প্রথম শহীদ মিনার। তাই এটি দ্রুত সংস্কার ও সংরক্ষণ করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
কমলনগর প্রেস ক্লাবের আহ্বায়ক এমএ মজিদ জানান, উপজেলার প্রথম নির্মিত এ শহীদ মিনারটির মর্যাদা রক্ষায় উদ্যোগ নিতে উপজেলা প্রশাসনের কাছে তারা দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু অদৃশ্য কারণে কেউই এ কাজে এগিয়ে আসছেন না।
তিনি বলেন, শহীদ মিনারটি পরিত্যাক্ত অবস্থায় ফেলে না রেখে এখান থেকে সরিয়ে যে কোনো একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর করলে অন্তত এর মর্যাদা রক্ষা পাবে।
কমলনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. কামরুজ্জামান জানান, স্থানীয়দের সঙ্গে আলোচনা করে শহীদ মিনারটির মর্যাদা রক্ষায় তিনি প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিবেন।

নিউজটি শেয়ার করুন:


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2018 Priyo Upakul
Design & Developed BY N Host BD
error: Content is protected !!