শনিবার, ৩১ জুলাই ২০২১, ০৭:৩২ অপরাহ্ন

মেঘনার ভাঙনে কমলনগরের বিস্তীর্ণ জনপদ বিলীন

মিজানুর রহমান মানিক :

মেঘনার কূল ঘেষে স্রোত আর প্রচন্ড জোয়ারের আঘাতে ভাঙন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। চোখের সামনেই নদীতে ভেঙে পড়ছে হাটবাজারের দোকানঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ, মক্তব, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ফসলের মাঠ, ঘরবাড়ি সহ বিস্তীর্ণ জনপদ। চলতি বর্ষা মওসুমের শুরুতেই নদীর ভাঙন মারাত্মক আকারে দেখা দিয়েছে। লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার চরকালকিনি ইউনিয়নের নাছিরগঞ্জ বাজারের প্রায় অর্ধেকের বেশি দোকানঘর ইতিমধ্যে নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। মারাত্মক হুমকির মুখে বাজারের অবশিষ্ট দোকানপাট, বাজার সংলগ্ন চরকালকিনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১ টি জামে মসজিদ, মক্তব, মোবাইল টাওয়ার, লোকালয়ের বসতবাড়ি সহ বিস্তীর্ণ জনপদ।

এদিকে সম্প্রতি একনেক সভায় রামগতি ও কমলনগর রক্ষায় একটি প্রকল্প অনুমোদন হলেও কাজ শুরুর আগে আরও কী পরিমাণ ভেঙে পড়ে এমন আতংকে নির্ঘুম রাত কাটছে তীরবর্তী মানুষের। দিশেহারা ব্যবসায়ী ও স্থানীয় এলাকাবাসী নিজস্ব উদ্যোগে ‘জংলাবাঁধ’ দিয়ে চেষ্টা করলেও শেষ রক্ষা হচ্ছে না। ভাঙন রোধে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে পানি উন্নয়ন বোর্ডের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন এলাকাবাসী।
ভাঙন কবলিত এলাকার ক্ষতিগ্রস্থ লোকজন, জনপ্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ৩০ বছর ধরে ভাঙছে নদী মেঘনা। এ রাক্ষুসে মেঘনার ভয়াবহ ভাঙনে ইতিমধ্যে লক্ষ্মীপুরের রামগতি ও কমলনগর উপজেলার প্রায় ২৪০ বর্গকিলোমিটার এলাকা বিলীন হয়েছে। এর মধ্যে শেষ ১০ বছরেই বিলীন হয়েছে ১৭০ বর্গকিলোমিটার এলাকা। অতি সম্প্রতি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি স্কুল ভবন। এটি রামগতি উপজেলার চর আলেকজান্ডার ইউনিয়নে অবস্থিত চরবালুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয়টি ১৯৯৫ সালে স্থাপিত হয়। নতুন ভবটি ২০১৬-১৭ অর্থবছরে নির্মাণ করে প্রাথমিক শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর। এনিয়ে রামগতি ও কমলনগর উপজেলার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের অন্তত ২০টি স্কুল ও মাদ্রাসা ভবন মেঘনা বক্ষে নিমজ্জিত হয়ে অন্যত্র স্থানান্তরিত হতে হয়েছে। রামগতির রঘুনাথপুরের পন্ডিতেরহাট, আলেকজান্ডারের আসলপাড়া মাছবাজার, সেবাগ্রাম মাছবাজার, কমলনগরের ঐতিহ্যবাহী কাদির পন্ডিতের হাট, মাতাব্বর হাট, সাহেবের হাট, তালতলি বাজার, লুধুয়াবাজার সহ ছোটবড় হাটবাজার স্থানান্তরিত হয়েছে ৭ টি। বর্তমানে নাছিরগঞ্জ বাজারটি বিলীন হয়ে পড়ছে।
নাছিরগঞ্জ বাজারের ঘর-মালিক ও স্থানীয় চরমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক প্যানেল চেয়ারম্যান আবুল কাশেম মেম্বার বলেন, ৫ কিলোমিটার দূরের থাকা মেঘনা এখন এ বাজারের দোকান ঘর, স্বপ্নের সাজানো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভেঙে নিয়ে যায়। তালতলি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ১ টি কাওমি মাদ্রাসা ও জামে মসজিদ সহ বাজারটি বিলীন হওয়ার পথে।
ভাঙনের শিকার আবুল কাশেম মেম্বার সহ অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্তদের মতে, মেঘনার ভাঙনের ভয়াবহতা বিগত সময়ের তুলনায় তিনগুণ বেশি। গত ১০ বছরে লক্ষাধিক মানুষ মেঘনায় ভিটেমাটি হারিয়ে বাস্তুহারা হয়েছে। সর্বশেষ গত দুই বছর ধরে মেঘনার ভাঙন ছাড়াও লোকালয়ে ও ফসলি জমিতে অস্বাভাবিক জোয়ারের পানি ঢুকে পড়ছে। চলতি বছরে নতুন সমস্যা যোগ হয়েছে জোয়ারের পানিতে অতিরিক্ত লবণাক্ততা। এমন পরিস্থিতিতে ভাঙনকবলিত মেঘনাপাড় এলাকায় স্থায়ী ও টেকসই বাঁধ নির্মাণের দাবি করেছেন এলাকাবাসী।
স্থানীয় সূত্রে আরও জানা যায়, লক্ষ্মীপুর সদর এবং কমলনগর উপজেলার পশ্চিম সীমানার উত্তর-দক্ষিণ এবং রামগতি উপজেলার পশ্চিম ও দক্ষিণ বরাবর মেঘনা নদী বহমান। কমলনগর উপজেলায় মেঘনার দৈর্ঘ্য ১৭ এবং রামগতিতে ২০ কিলোমিটার। দুই উপজেলার ৩৭ কিলোমিটার মেঘনা নদী তীরবর্তী এলাকায় প্রতিনিয়ত চলছে ভাঙন। ১৯৯১ সালের আদমশুমারি প্রতিবেদনে সাবেক রামগতি (রামগতি-কমলনগর) উপজেলার আয়তন ছিল ৬৬৩ বর্গকিলোমিটার। ২০ বছর পর ২০১১ সালের আদমশুমারি প্রতিবেদনে সে আয়তন উল্লেখ করা হয় ৫৯৪ বর্গকিলোমিটার। যাতে দেখা যায় ২০ বছরে মেঘনায় বিলীন হয়ে যায় ৬৯ বর্গকিলোমিটার এলাকা। ২০১১ সালের পর আর কোনো আদমশুমারি হয়নি। এর মধ্যে এ অঞ্চলে নদীভাঙনের গতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
ভাঙনকবলিত হয়ে প্রায় ইউনিয়নগুলোর একটি কমলনগর উপজেলার ১ নং চর কালকিনি। ইউপির চেয়ারম্যান মাস্টার মোঃ ছায়েফ উল্যাহ জানান, ভাঙনের নিষ্ঠুর শিকার হয়ে এপর্যন্ত পাঁচবার বার তার নিজ বসতবাড়ি স্থানান্তর করতে হয়েছে। বর্তমান ৬ষ্ঠতম স্থানের বাড়িটি নদীর নিরাপদ দূরত্ব রেখে পাশের ইউনিয়ন চর মার্টিন এলাকায় স্থানান্তরিত করা হয়। এখন তাও হুমকিতে রয়েছে। বাঁধ না থাকায় নদীর জোয়ারের পানিতে বাড়ির আঙিনা সহ আশপাশ নিমজ্জিত হয়ে পড়ে।
ভাঙনের তীব্রতায় গত ৫ বছরেই বিলীন হয়েছে কমলনগর উপজেলার ৪টি ইউনিয়নের ১৫টি ওয়ার্ড। সর্বশেষ কী কারণে মেঘনায় এত ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে, স্থানীয়ভাবে কেউই তা জানাতে পারছেন না। তবে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রামগতি ও কমলনগরের কিছু এলাকায় আগে মাটির বেড়িবাঁধ ছিল। ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলার আঘাতে বাঁধের ৩৭ কিলোমিটার মেঘনা নদীতে বিলীন হয়ে যায়। এর পর সেই বাঁধ আর নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। তখন থেকেই লোকালয়ে জোয়ারের পানি ঢুকে ভাঙন ত্বরান্বিত করছে। আপদকালীন দ্রুত বালি ভর্তি জিওব্যাগ ডাম্পিং করে নাছিরগঞ্জ বাজারটি রক্ষার দাবি করেন।
কমলনগর উপজেলা মাদ্রাসা শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও চর ফলকন সিদ্দিকীয়া দাখিল মাদ্রাসার সুপার মাওলানা হাবিব উল্ল্যাহ বাহার জানান, তার লুধুয়াবাজারস্থ মাদ্রাসাটি ভাঙনের শিকার হলে ফলকন বোর্ডঅফিস এলাকায় স্থানান্তর করা হয়। তার মতে, সরকার ইতিমধ্যে নদীভাঙন প্রতিরোধে বাঁধ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। টেকসই বাঁধ নির্মাণে একনেকে সরকার একটা বরাদ্দ অনুমোদন করেছে। এ ফাইলটি দ্রুত এগিয়ে নিয়ে এ এলাকার মানুষের ভিটেমাটি রক্ষা করা জরুরি।
কমলনগর-রামগতি আসনের সংসদ মেজর (অব) আবদুল মান্নান বলেন, দুই উপজেলার নদীভাঙন রোধ করতে একটি প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে। আশা করি, সে প্রকল্পের মাধ্যমে নদীর তীররক্ষা করা সম্ভব হবে। আমি সেনাবাহিনীর মাধ্যমে বাঁধ নির্মাণ কাজটি দ্রুত বাস্তবায়ন করতে প্রধানমন্ত্রী বরাবর পত্র প্রেরণ করা হয়।
লক্ষ্মীপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী ফারুক আহমেদ বলেন, জেলার ৪টি উপজেলা উপকূলীয় হলেও রামগতি এবং কমলনগরে ব্যাপক হারে নদী ভাঙছে। তিনি আরও জানান, দুটি উপজেলার মেঘনা নদীর ৩১ কিলোমিটার তীর রক্ষাবাঁধ নির্মাণের লক্ষ্যে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ৩ হাজার ৮৯ কোটি ৯৬ লাখ ৯৯ হাজার টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে। প্রকল্পটির অর্থছাড় পেলে বাঁধের কাজ শুরু হবে বলেও জানান পানি উন্নয়ন বোর্ডের এ কর্মকর্তা।
নিউজটি শেয়ার করুন:


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2018 Priyo Upakul
Design & Developed BY N Host BD
error: Content is protected !!