বৃহস্পতিবার, ১৭ জুন ২০২১, ১১:০৪ পূর্বাহ্ন

প্রধানমন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে কমলনগর-রামগতিবাসী

নিজস্ব প্রতিবেদক : মেঘনা নদীর ভয়াবহ ভাঙন থেকে লক্ষ্মীপুরের কমলনগর ও রামগতি উপজেলাকে রক্ষায় একটি বৃহৎ প্রকল্প হাতে নিচ্ছে পানিসম্পদ মন্ত্রণায়। তিন হাজার ৮৯ কোটি ৯৬ লাখ ৯৯ হাজার টাকার ওই প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য মঙ্গলবার (১ জুন) অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপন করা হবে। প্রকল্পটি অনুমোদন হলে মেঘনা নদীর ভাঙন থেকে প্রকল্প এলাকায় অবস্থিত কৃষিজমি, হাট-বাজার, স্কুল-কলেজ-মাদরাসা, সড়ক ও সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন অবকাঠামো রক্ষা করা সম্ভব হবে। সেই সঙ্গে ১৩ লাখ ৯৯ হাজার ২২০ কোটি টাকার সম্পদ রক্ষা পাবে বলে আশা করছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে মেঘনার ভাঙনরোধে দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত প্রকল্পটি একনেক সভায় উপস্থাপনের খবরে আশায় বুক বেঁধেছেন কমলনগর ও রামগতি উপজেলার ছয় লাখ মানুষ। তাদের আশা চার বছর আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী উপকূলীয় এ এলাকার বাসিন্দাদের স্বপ্ন পূরণ করবেন। তাই একনেক সভার সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে আছেন উপকূলীয় এ জনপদের বাসিন্দারা।
বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ১৯৭০ সালের দিকে মেঘনা তীরবর্তী কমলনগর উপজেলার চরকালকিনি ও চরফলকন এবং রামগতি উপজেলার চরআলেকজান্ডার, চরআব্দুল্লাহ, চরআলগী, চররমিজ, বড়খেরী ও চরগাজী ইউনিয়নগুলোতে মেঘনার ভাঙন শুরু হয়। দীর্ঘ পাঁচ দশকের মেঘনার এ অব্যাহত ভাঙনে ইউনিয়নগুলোর চরকাঁকড়া, চরসামছুদ্দিন ও তালতলি, সাহেবেরহাট, চরজগবন্ধু, মাতাব্বরনগর, চরকটোরিয়া, চরকৃষ্ণপুর, মাতাব্বরচর, পাতারচর, উরিরচর, পশ্চিম চরফলকন ও ডিএস ফলকন, বাংলাবাজার, আসলপাড়া ও রঘুনাথপুরসহ অসংখ্য গ্রাম সম্পূর্ণ মেঘনার গর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এতে করে ওইসব গ্রামসহ বর্তমানে ভাঙনকবলিত গ্রামগুলোর দেড় লক্ষাধিক মানুষ সহায়-সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন। এদের বেশীরভাগই পার্শ্ববর্তী জেলা নোয়াখালীর সদর, সুবর্ণচর, লক্ষ্মীপুর সদর, রামগতি উপজেলার চরপোড়াগাছা ও কমলনগর উপজেলার চরকাদিরাসহ বিভিন্ন এলাকায় বাড়িঘর নির্মাণ করে কোনো রকম বসবাস করছেন। বাকীরা আশ্রয় নিয়েছেন বিভিন্ন এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বেড়িবাঁধের ওপর। যাদের অধিকাংশেরই এখন দিনকাটে অর্ধাহরে-অনাহারে।
সূত্র মতে, গত ৫০ বছরের ভাঙনে মেঘনা গর্ভে বিলীন হয়েছে ওইসব এলাকার প্রায় ৩০ হাজার একর ফসলি জমি, সরকারি-বেসরকারি অর্ধশত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র, আশ্রয়ণ কেন্দ্রের কলোনি, পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধ এবং কাঁচা-পাকা সড়কসহ অসংখ্য মসজিদ, বিভিন্ন স্থাপনা ও হাটবাজার।
জানা গেছে, মেঘনার এ ভাঙনরোধে স্থানীয়ভাবে একাধিকবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা সফলতার মুখ দেখেনি। ২০০৯ সালে প্রথমবার মহাজোট সরকার গঠনের পর আওয়ামী লীগ নেতা অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমানের প্রচেষ্টায় ‘মেঘনার ভাঙন থেকে রামগতি ও কমলনগরকে রক্ষায় নদীর তীর সংরক্ষণ প্রকল্প’ নামে একটি প্রকল্প অনুমোদিত হয়। প্রকল্পটির আওতায় ২০১৪ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) ১৯৮ কোটিসহ বিভিন্ন ধাপে আরও ৪৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়। প্রথম পর্যায়ের ওই অর্থ দিয়ে কমলনগর উপজেলার মাতাব্বরহাট এলাকায় এক দশমিক ২ কিলোমিটার ও রামগতি উপজেলায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকায় ব্লকবাঁধ নির্মাণ করা হয়। কিন্তু দু’উপজেলার অপর ৩১ দশমিক ৩২ কিলোমিটার এলাকা অরক্ষিত থেকে যায়। ভাঙনকবলিত ওইসব এলাকা রক্ষার দাবিতে এলাকাবাসী বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও স্মারকলিপি পেশসহ বিভিন্ন কর্মসূচির পালনের একপর্যায়ে ২০১৭ সালে লক্ষ্মীপুর সফরে এসে এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভাঙনরোধে প্রকল্প গ্রহণের ঘোষণা দেন। এরই ধারাবাহিকতায় পানি উন্নয়ন বোর্ড ‘রামগতি ও কমলনগর উপজেলাধীন বড়খেরী ও লুধুয়া বাজার এবং কাদিরপন্ডিতের হাট এলাকা ভাঙন হতে রক্ষাকল্পে মেঘনা নদীর তীর সংরক্ষণ’ শীর্ষক একটি প্রকল্পের ডিপিপি প্রস্তুত করে ২০২০ সালে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। কিন্তু ওই প্রস্তাবনাটি পিইসি সভা অনুমোদন না দিয়ে অর্থের চাহিদা কমিয়ে ডিপিপি পুনর্গঠিত করতে নির্দেশ দেয়। নির্দেশনা অনুযায়ী পানি উন্নয়ন বোর্ড পুনরায় সার্ভে করে ১৯৭ কোটি টাকা কমিয়ে তিন হাজার ৮৯ কোটি ৯৬ লাখ ৯৯ হাজার টাকার একটি নতুন প্রকল্প গ্রহণের প্রস্তাবনা পাঠায়। স্থানীয় সংসদ সদস্য মেজর (অব.) আবদুল মান্নান ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক উপ-কমিটির সদস্য আবদুজ্জাহের সাজুর প্রচেষ্টায় ওই প্রকল্পের প্রস্তাবনাটি গত ১৭ মে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান কর্তৃক স্বাক্ষরিত হয়ে একনেক সভায় উপস্থাপনের অপেক্ষায় রয়েছে। পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা যায়, ভাঙন রোধের এ প্রকল্পটি নিয়ে গত বছরের ৭ অক্টোবর প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় আলোকে পরিকল্পনা কমিশন প্রকল্পটি একনেকে উপস্থাপনের সুপারিশ করে। সে অনুযায়ী মঙ্গলবার (১ জুন) এ সংক্রান্ত প্রকল্পটিসহ আরও ১৩টি প্রকল্প জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এ প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্যে হচ্ছে-প্রতি বছর ২৫০ থেকে ৩০০ মিটার নদী ভাঙনের কবল হতে এলাকাকে রক্ষাকরণ, নদীভাঙন হতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ৫৯/২ নম্বর পোল্ডার এবং ৫৯/২ (সম্প্রসারণ) এর বাঁধ রক্ষাকরণ, মেঘনা নদীর বামতীর বরাবর ভাঙনকবলিত ৩১ দশমিক ৩২৬ কিলোমিটার স্থায়ী প্রতিরক্ষা কাজ বাস্তবায়নের মাধ্যমে লক্ষ্মীপুর জেলার রামগতি ও কমলনগর উপজেলাধীন কৃষিজমি, বাজার, স্কুল-কলেজ, মাদরাসা, সড়ক ও বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি অবকাঠামো রক্ষাকরণ এবং নদীভাঙন রোধের মাধ্যমে আনুমানিক ১৩ লাখ ৯৯ হাজার ২২০ কোটি টাকার বিভিন্ন অবকাঠামো রক্ষাসহ প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর এলাকা পরিবেশগত উন্নয়নের মাধ্যমে জনগণের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন।
এদিকে মেঘনার ভাঙনরোধে প্রস্তাবিত প্রকল্পটি একনেক সভায় উপস্থাপনের খবরে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছেন কমলনগর-রামগতিবাসী। ভিটে-মাটি রক্ষায় প্রকল্পটি অনুমোদন ও অর্থ ছাড়সহ দ্রুত টেকসই বাঁধ নির্মাণে প্রধানমন্ত্রীর সু-দৃষ্টি কামনা করছেন তারা। আবুল খায়ের, সফিকুল ইসলাম, মোস্তাফিজুর রহমান, হারুনুর রশিদ ও আবু তাহেরসহ ভাঙনকবলিত এলাকার বাসিন্দারা বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নিকট আমরা অন্য কোনো সাহায্য চাই না; শুধু ভাঙনরোধের এ প্রকল্পটি অনুমোদনের দাবি জানাচ্ছি।
কমলনগর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা একেএম নুরুল আমিন মাস্টার ও রামগতি উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক আব্দুল ওয়াহেদ বলেন, মেঘনা নদীর অব্যাহত ভাঙনে রামগতি-কমলনগরের হাজার হাজার মানুষ দিন দিন সহায়-সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছেন। মেঘনার এ ভাঙনরোধে প্রকল্প গ্রহণে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতিও রয়েছে। তাই প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষরে প্রস্তাবিত প্রকল্পটি অনুমোদনের মাধ্যমে এ অঞ্চলের মানুষের স্বপ্ন পূরণ হবে বলে আমরা আশা করছি।
কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক উপ-কমিটির সদস্য আবদুজ্জাহের সাজু বলেন, নদী ভাঙনরোধে কার্যক্রর উদ্যোগ গ্রহণ উপকূলীয় এ অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি। বিষয়টি মাথায় রেখে জন্মস্থান রক্ষায় প্রকল্পটি অনুমোদনে আমি বিভিন্ন কার্যালয়ে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে আসছি। আশা করছি, এ অঞ্চলের ভাঙনকবলিত মানুষের কথা প্রধানমন্ত্রী বিবেচনা করবেন।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের লক্ষ্মীপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী ফারুক আহমেদ জানান, তাদের প্রস্তাবিত ৩১ দশমিক ৩২ কিলোমিটার তীর রক্ষা বাঁধের একটি প্রকল্প একনেকে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদন পেলে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড চলতি বছর থেকে শুরু করে ২০২৫ সালের জুনের মধ্যে এটি বাস্তবায়ন করবে।
এ বিষয়ে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. মতিউর রহমান বলেন, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রকল্প এলাকায় অবস্থিত বসতবাড়ি, স্কুল-কলেজ, মসজিদ, মাদরাসা, হাট-বাজার, রাস্তাঘাট, ইউনিয়ন পরিষদ, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন অবকাঠামো মেঘনা নদীর ভাঙন থেকে রক্ষা এবং এলাকার আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন অব্যাহত রাখা সম্ভব হবে। এসব বিবেচনায় প্রকল্পটি অনুমোদনের সুপারিশ করা হয়েছে।
লক্ষ্মীপুর-৪ (রামগতি-কমলনগর) আসনের সংসদ সদস্য মেজর (অব.) আবদুল মান্নান জানান, দীর্ঘ কয়েক যুগ ধরে মেঘনার ভাঙনে এ এলাকার হাজারো মানুষ সর্বস্ব হারিয়েছেন। ভাঙন প্রতিরোধে ব্যক্তিগত অর্থে বাঁধ নির্মাণসহ তিনি বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ভাঙনের তীব্রতার কারণে তার সেই উদ্যোগ সফল হয়নি। এখন ভাঙনরোধে তিন হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প একনেক সভায় উঠছে। প্রকল্পটি অনুমোদন হলে এ এলাকার ছয় লাখ মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন বাস্তবায়ন হবে।

নিউজটি শেয়ার করুন:


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2018 Priyo Upakul
Design & Developed BY N Host BD
error: Content is protected !!