শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৭:১১ অপরাহ্ন

তিনদিন ধরে মেঘনার অস্বাভাবিক জোয়ারে ভাসছে কমলনগর-রামগতি

নিজস্ব প্রতিবেদক : তিনদিন ধরে মেঘনা নদীর অস্বাভাবিক জোয়ারে ভাসছে উপকূলীয় জেলা লক্ষ্মীপুরের কমলনগর ও রামগতি উপজেলার নিম্নাঞ্চল। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ ও অমাবস্যার প্রভাবে বুধবার থেকে মেঘনার জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে পাঁচ থেকে ছয় ফুট বেড়ে এ অবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে। এতে দুই উপজেলার অর্ধলাখ মানুষকে প্রতিদিন দুইবার করে আট ঘণ্টা পানিবন্দি অবস্থায় দিন কাটাতে হচ্ছে। রান্নাঘর ও চুলা পানিতে নিমজ্জিত থাকায় ওই সব পরিবারগুলোর মাঝে চরম খাদ্য সঙ্কট দেখা দিয়েছে। তবে, তাদের মাঝে শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
এলাকাবাসী জানান, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ ও অমাবস্যার প্রভাবে বুধবার বিকেল থেকে মেঘনার জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে পাঁচ থেকে ছয় ফুট বাড়তে থাকে। এতে করে প্রতিদিন দুইবার করে কমলনগর উপজেলার মতিরহাট, চরসামছুদ্দিন, পশ্চিম মার্টিন, নাছিরগঞ্জ, কাদিরপণ্ডিতেরহাট, পশ্চিম চরলরেন্স, চরজগবন্ধু, মাতাব্বরহাট, লুধুয়া ফলকন ও পাটারীরহাট এবং রামগতি উপজেলার সুজনগ্রাম, জনতা বাজার, পশ্চিম বালুরচর, মুন্সীরহাট, সেবাগ্রাম, চরআলগী, বড়খেরী, চরগাজী, চরগজারিয়া ও তেলিরচর এলাকাসহ নিম্নাঞ্চলীয় এলাকা জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়ে পড়ে। পানিতে প্লাবিত হয় ওই সব এলাকার অন্তত ১৫টি বাজার। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় কাঁচা বসতঘরসহ বাজারগুলোর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের। পানিতে ভেসে যায় কয়েকশ’ পুকুর ও ঘেরের কোটি কোটি টাকার মাছ। কমলনগর উপজেলার তোরাবগঞ্জ-মতিরহাট সড়ক বিধ্বস্ত হয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়াসহ দুই উপজেলার বিভিন্ন এলাকার অসংখ্য ব্রিজ-কালভার্ট ও সড়ক বিধ্বস্ত হয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। এছাড়া হাজার হাজার একর শাক-সবজি, আমনের বীজতলা, সদ্য রোপা আমন ও উঠতি আউশ ধান ক্ষেত নোনা পানিতে নিমজ্জিত থাকায় কৃষি ক্ষেত্রেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
কমলনগর উপজেলার চরলরেন্স এলাকার মো. জামাল, আমজাদ খলিফা ও আব্দুল হাই জানান, জোয়ারের স্রোতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বিধ্বস্ত হয়ে তারা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছেন।
পশ্চিম চর মার্টিন এলাকার এলাকার আব্দুর রব বেপারী জানান, অস্বাভাবিক জোয়ারে তার তিনটি পুকুরের দুই লক্ষাধিক টাকার মাছ পানিতে ভেসে গেছে।
চরলরেন্স ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এএইচএম আহসান উল্যাহ হিরন জানান, জোয়ারের ¯্রােতে তার ইউনিয়নের নবীগঞ্জ-লরেন্স সড়কের একটি, হাজি রোডের একটি এবং নুরিয়া রোডের একটি পুল (ব্রিজ) বিধ্বস্ত হয়েছে। এতে সড়কগুলোতে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় এলাকাবাসী চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।
একই উপজেলার চরকালকিনি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাস্টার ছায়েফ উল্যাহ, সাহেবেরহাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আবুল খায়ের, চরফলকন ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হাজি হারুনুর রশিদ ও পাটারীরহাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট একেএম নুরুল আমিন রাজু জানান, মেঘনার ভাঙনের মুখে পড়ে বেড়িবাঁধ বিলীন হয়ে যাওয়ায় জোয়ার বাড়লেই তাদের ইউনিয়নের নদী তীরবর্তী এলাকাগুলো পানিতে প্লাবিত হয়ে যায়। গত তিনদিনের জোয়ারে তাদের ইউনিয়নে রাস্তা-ঘাটের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়াসহ মৎস্য খাতের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া রান্নাঘর ও চুলা পানিতে ডুবে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মাঝে খাদ্য সঙ্কট দেখা দিয়েছে। সরকারি বরাদ্দ না পেলেও নিজেদের অর্থে তারা ওই সব পরিবারের মাঝে শুকনো খাবার বিতরণ করছেন।
রামগতি উপজেলার চর আলগী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাকির হোসেন লিটন চৌধুরী জানান, জোয়ারে তার ইউনিয়নের বেশ কিছু বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানিতে ভেসে গেছে অসংখ্য পুকুর ও ঘেরের মাছ। এছাড়া ব্রিজ, কালভার্ট ও কাঁচা-পাকা সড়ক বিধ্বস্ত হয়ে বেশ কয়েকটি এলাকায় স্থানে যোগযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বলে তিনি জানান।


একই উপজেলার চর আব্দুল্লাহ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন জানান, চারদিকে মেঘনা নদী বেষ্টিত তার ইউনিয়নের প্রায় ২০ হাজার মানুষ তিনদিনের অস্বাভাবিক জোয়ারের পানিতে মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন। জোয়ারের স্রোতে তার ইউনিয়নের অসংখ্য বসতঘর এবং চেয়ারম্যান বাজার ও জনতা বাজারের দোকানঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এছাড়া ১৪টি কাঠের ব্রিজ ধসে পড়াসহ কাঁচা সড়কগুলো চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় এলাকাবাসী চরম দুর্ভোগে রয়েছেন।
রামগতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আব্দুল মোমিন জানান, মেঘনার ভাঙনের মুখে বেড়িবাঁধ বিলীন হয়ে যাওয়ায় অস্বাভাবিক জোয়ারের পানিতে নিম্নাঞ্চলীয় এলাকাগুলো প্লাবিত হয়ে পড়ে। জোয়ারে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করার জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের বলা হয়েছে।
তিনি বলেন, ব্রিজ-কালভার্ট ও সড়ক জরুরি ভিত্তিতে মেরামত করে চলাচলের উপযোগী করার জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে বলা হয়েছে। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর জন্য ১০ মেট্রিক টন চাল ও নগদ এল লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়ার পাশাপাশি খাদ্য সঙ্কটে থাকা পরিবারগুলোর মাঝে শুকনো খাবার বিতরণ করা হচ্ছে।

নিউজটি শেয়ার করুন:


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2018 Priyo Upakul
Design & Developed BY N Host BD
error: Content is protected !!