বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২০, ০৭:৩০ অপরাহ্ন

কমলনগরে মানবিক সহায়তা কর্মসূচির উপকারভোগীর তালিকা তৈরি নিয়ে জটিলতা

নিজস্ব প্রতিবেদক : করোনা সঙ্কটে মানবিক সহায়তা কর্মসূচির উপকারভোগীর তালিকা তৈরি নিয়ে লক্ষ্মীপুরের কমলনগরে জটিলতা দেখা দিয়েছে। কর্মসূচিটি বাস্তবায়নের লক্ষে ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন পর্যায়ের কমিটি গঠনে রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি মনোনয়ন এবং উপকারভোগীর তালিকা তৈরি নিয়ে উপজেলা পরিষদের কোটা (ওয়ার্ড প্রতি ৩০টি) চেয়ে নিয়ম বহির্ভূত হস্তক্ষেপে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। যে কারণে, মঙ্গলবারের (৫ এপ্রিল) মধ্যে উপকারভোগীদের তালিকা তৈরি করে উপজেলা কমিটির কাছে জমা দেওয়ার কথা থাকলেও তা সম্ভব হচ্ছে না। এতে করে মেঘনা উপকূলীয় দারিদ্রপীড়িত এ উপজেলায় সরকারের এ কর্মসূচিটি বাস্তবায়ন নিয়ে শঙ্কা দেখা দেওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা।
জানা গেছে, করোনাভাইরাসের কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কর্মহীন মানুষদের জন্য সরকার মানবিক সহায়তা কর্মসূচির উদ্যোগ নিয়েছেন। এ কর্মসূচিতে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় ভাতা ও সুবিধাপ্রাপ্ত পরিবার ব্যতীত উপজেলার সাত হাজার ৫০০ দুস্থ পরিবার সরকারি বিভিন্ন সহায়তা পাবেন। কর্মসূচিটি বাস্তবায়নের লক্ষে উপজেলা পর্যায়ের গঠিত কমিটি সম্প্রতি সভা করে ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন কমিটি গঠন করে উপকারভোগীর তালিকা তৈরির জন্য জনপ্রতিনিধিদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন। নির্দেশনা অনুযায়ী ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন কমিটিতে ক্ষমতাসীন দলের চারজন করে প্রতিনিধি নিয়ে প্রত্যেক ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের মনোনীত ব্যক্তিকে নিয়েই কমিটিগুলো করা হয়। ইতোমধ্যে ওই কমিটিগুলোর মাধ্যমে উপকারভোগীদের তালিকা তৈরির কাজ সম্পন্ন হওয়ার পথে। কিন্তু এরই মধ্যে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের কার্যালয় থেকে প্রতিটি ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন কমিটিতে রাজনৈতকি প্রতিনিধি হিসেবে যুবলীগ নেতাদের নাম মনোনীত করে ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে তালিকা দেওয়া হয়। পাশাপাশি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক মেজবাহ উদ্দিন আহম্মেদ বাপ্পী তিন দিন আগে প্রত্যেক ইউপি চেয়ারম্যানের মুঠোফোনে একটি খুদে বার্তা পাঠান। এতে প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের ২০, ভাইস চেয়ারম্যানের ১০ এবং রাজনৈতিক দলের মনোনীত ২০ জন উপকারভোগী তালিকাভুক্ত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
এদিকে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক প্রতিনিধি মনোনয়নের চিঠি ও উপকারভোগীর তালিকা তৈরিতে উপজেলা পরিষদের ওয়ার্ড প্রতি ৩০টি কোটা চেয়ে নতুন এ বার্তা পেয়ে বিপাকে পড়ে যান ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা। ক্ষুব্ধ ওই সব জনপ্রিতিনিধিদের দাবি, স্থানীয় আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমন্বয় করে তারা ইতোমধ্যে ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন কমিটি গঠন করে উপকারভোগীর তালিকা তৈরির কাজ প্রায় সম্পন্ন করে ফেলেছেন। কিন্তু হঠাৎ করে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের মানবিক সহায়তা কর্মসূচির নীতিমাল বহির্ভূত এ নির্দেশনা পেয়ে তাদের কাজ স্থবির হয়ে পড়েছে। যে কারণে, তালিকা তৈরির কাজ শেষ করে মঙ্গলবার (৫ এপ্রিল) এ কর্মসূচির উপজেলা কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে জমা দেওয়ার কথা থাকলেও তারা দিতে পারছেন না।
উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানরা জানান, মানবিক সহায়তা কর্মসূচির উপজেলা কমিটির সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তারা ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন কমিটিগুলো করে উপকারভোগীর তালিকা প্রস্তুত করেছেন। এখন উপজেলা পরিষদের চেয়রম্যান যে নির্দেশনা দিয়েছেন, তা সম্পূর্ণ নীতিমালা বহির্ভূত। যে কারণে, উপজেলা পরিষদের কোটার বিষয়টি ইউপি সদস্যসহ কোনো জনপ্রতিনিধি মেনে নিতে পারছেন না। তাছাড়া কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে প্রতিনিধি মনোনয়নে আওয়ামী লীগও ছাড় দিতে রাজি হচ্ছে না। সবমিলে এ মানবিক সহায়তা কর্মসূচি নিয়ে এখানে চরম জটিলতা দেখা দিয়েছে।
উপজেলার পাটারীরহাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট একেএম নুরুল আমিন রাজু জানান, মানবিক সহায়তা কর্মসূচির উপজেলা কমিটি তার ইউনিয়ন থেকে ৮০০ দুস্থ পরিবারের নাম তালিকাভুক্ত করে জমা দিতে বলে। নিয়ম অনুযায়ী গঠিত ওয়ার্ড কমিটির মাধ্যমে তারা ৯টি ওয়ার্ড থেকে ৮৮ জন করে উপকারভোগীর তালিকা করেছেন। কিন্তু সেখান থেকে উপজেলা পরিষদ ৩০ এবং রাজনৈতিক দলের জন্য ২০টি করে কোটা চেয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান এখন খুদে বার্ত পাঠিয়েছেন। এ হিসেবে ইউনিয়ন পরিষদের জন্য মাত্র ৪৪ শতাংশ উপকারভোগীর নাম দেওয়ার সুযোগ থাকে। অথচ এ কর্মসূচির শতভাগ দায়ভার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের।
উপজেলার চরকালকিনি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাস্টার মো. ছায়েফ উল্যাহ জানান, সভা ডেকে তিনি পরিষদের সদস্যদেরকে উপজেলা পরিষদের কোটা চাওয়া বিষয়টি জানিয়েছেন। কিন্তু ওই সভায় কোনো সিদ্ধান্ত না দিয়ে ক্ষুব্ধ সদস্যরা সভা থেকে বেরিয়ে যান।
উপজেলার চরকাদিরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাওলানা খালেদ সাইফুল্যাহ বলেন, নীতিমালা অনুযায়াই আমরা উপকারভোগীর তালিকা প্রস্তুত করছি। উপজেলা পরিষদের কোটার জন্য উপজেলা কমিটিতে তা অনুমোদন না হলেও নিয়ম বহির্ভূত কোনো কাজ আমার পরিষদ করবে না।
স্থানীয় সংসদ সদস্যের প্রতিনিধি ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি একেএম নুরুল আমিন মাস্টার জানান, নীতিমালা অনুযায়ী এ কর্মসূচির উপকারভোগী নির্বাচনের এখতিয়ার সম্পূর্ণ ইউনিয়ন পরিষদের। যেখানে সংসদ সদস্য এ উপকারভোগী নির্বাচনে কোনো হস্তক্ষেপ করেনি; সেখানে উপজেলা পরিষদের কোটা চাওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।
ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন কমিটিতে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধির স্থলে যুবলীগের একজন করে প্রতিনিধি মনোনয়নের হস্তক্ষেপ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দলের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ওই সব কমিটিতে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধিই থাকবেন।
তবে, এসব বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক মেজবাহ উদ্দিন আহমেদ বাপ্পীর মুঠোফোনে একাধিকবার কল করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
মানবিক সহায়তা কর্মসূচির উপজেলা কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোবারক হোসেন জানান, নীতিমালা অনুযায়ী গঠিত কমিটির মাধ্যমেই উপকারভোগীদের তালিকা তৈরি করার কথা। এক্ষেত্রে কোটা চেয়ে হস্তক্ষেপ করার কোনো এখতিয়ার উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বা ভাইস চেয়ারম্যানদের নেই।
তিনি বলেন, নীতিমালার আলোকে দ্রুত তালিকা প্রস্তুত করে জমা দেওয়ার জন্য ইউপি চেয়ারম্যানদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

নিউজটি শেয়ার করুন:


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2018 Priyo Upakul
Design & Developed BY N Host BD
error: Content is protected !!