বুধবার, ১২ জুন ২০২৪, ০৯:০৯ অপরাহ্ন

আজ লক্ষ্মীপুর হানাদার মুক্ত দিবস

নিজস্ব প্রতিবেদক : আজ ৪ ডিসেম্বর লক্ষ্মীপুর হানাদার মুক্ত দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিন ভোরে লক্ষ্মীপুর শহরের বাগবাড়িস্থ পাকবাহিনীদের প্রধান ঘাঁটি আক্রমণ করেন মুক্তিযোদ্ধারা। এ সময় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবল গুলি বর্ষণের মুখে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন ওই ঘাঁটির দুই শতাধিক রাজকার ও হানাদার সদস্য। এটাই ছিল লক্ষ্মীপুরে হানাদারবিরোধী মুক্তিযোদ্ধাদের শেষ প্রতিরোধ। দীর্ঘ ৯ মাসের যুদ্ধকালীন সময়ে পাকবাহিনী এ দেশিয় দোসর রাজাকারদের সহায়তায় জেলার বিভিন্নস্থানে ব্যাপক অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও ধর্ষণসহ শত শত নিরীহ জনসাধারণকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। তবে থেমে থাকেননি লক্ষ্মীপুরের দামাল ছেলেরাও। একের পর এক ৩৭ বার সম্মুখ যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে তারা আজকের এই দিনে লক্ষ্মীপুরকে হানাদার মুক্ত করে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তলন করেন।
জেলার মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে লক্ষ্মীপুর-বেগমগঞ্জ সড়কের প্রতাপগঞ্জ উচ্চবিদ্যালয়, মান্দারী মসজিদ, মাদাম ঘাঁট ও বাগবাড়ি, লক্ষ্মীপুর-রামগঞ্জ সড়কে দালাল বাজার, কাজীর দিঘীরপাড়, কাফিলাতলী, পানপাড়া, মীরগঞ্জ, পদ্মা বাজার, মঠেরপুল, রামগঞ্জের হাইস্কুল সড়ক ও আঙ্গারপাড়া, লক্ষ্মীপুর-রামগতি সড়কে চরকলাকোপা, জমিদারহাট, করুণানগর, হাজিরহাট ও আলেকজান্ডার, রায়পুর আলীয়া মাদ্রাসা এলাকায় পাকবাহিনী ও রাজাকারদের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের অধিকাংশ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ সময় শত শত নিরীহ মানুষ এবং ৩৫ জন মুক্তিযোদ্ধা শীহদ হন।
এ বীর শহীদরা হচ্ছেন-মনসুর আহমেদ, রবীন্দ্র কুমার সাহা, আলী আজম, লোকমান মিয়া, জয়নাল আবেদিন, মোহাম্মদ হোসেন, আবদুল বাকির, জহিরুল ইসলাম, আহাম্মদ উল্যাহ, আবদুল মতিন, মাজহারুল মনির সবুজ, চাঁদ মিয়া, নায়েক আবুল হাশেম, মো. মোস্তফা মিয়া, নুর মোহাম্মদ, রুহুল আমিন, আবুল খায়ের, আবদুল হাই, মমিন উল্যা, আবু ছায়েদ, আব্দুল হালিম বাসু, এসএম কামাল, মিরাজ উল্যা, মো. আতিক উল্লাহ, মো. মোস্তফা, ইসমাইল মিয়া, আবদুল্যাহ, আবুল খায়ের, সাহাদুল্লা মেম্বার, আবুল কালাম, মোস্তাফিজুর রহমান, বেনু মজুমদার, মোহাম্মদ আলী, নজরুল ইসলাম ও আবদুর রশিদ।
এদিকে, জেলা শহরের মাদাম ব্রিজ, বাগবাড়ি গণকবর, দালাল বাজার গালর্স হাইস্কুল, মডেল হাইস্কুল, মদিনউল্যা চৌধুরী (বটু চৌধুরী) বাড়ি, পিয়ারাপুর বাজার, মান্দারী মসজিদ ও প্রতাপগঞ্জ হাইস্কুল, রায়পুর আলীয়া মাদ্রাসা, এলএম হাইস্কুল ও ডাকাতিয়া নদীর ঘাট, রামগতির চরকলাকোপা মাদ্রাসা, ওয়াপদা বিল্ডিং, আলেকজান্ডার সিড গোডাউন, কমলনগরের হাজিরহাট মসজিদ, করইতলা গোডাউন, রামগঞ্জ সরকারি হাইস্কুল, জিন্নাহ হল (জিয়া মার্কেট) ও ডাকবাংলো হানাদারদের ক্যাম্প ও গণহত্যার কলঙ্কিত স্থান।
লক্ষ্মীপুরের প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধারা জানান, মুক্তিযুদ্ধকালীন কমান্ডার প্রয়াত রফিকুল ইসলাম মাস্টারের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা ১ ডিসেম্বর মিলেটারিদের বাগবাড়ী ক্যাম্প দূর থেকে ঘেরাও করেন। প্রবল গুলি বর্ষণ করতে করতে উক্ত ঘাঁটির রাজাকার ও হানাদারদের অবরুদ্ধ রেখে ৩ ডিসেম্বর ঘাঁটির খুব কাছাকাছি ঘিরে ফেলেন তারা। মুক্তিযোদ্ধাদের এমন আক্রমণের মুখে রাজাকার ও হানাদাররা অসহায় হয়ে পড়ে। পরে ৪ ডিসেম্বর ভোরে হানাদাররা আত্মসমর্পণ করে লক্ষ্মীপুর ছেড়ে চলে যায়। যুদ্ধের নয়মাস শহরের বাগবাড়িস্থ বিশাল সারের গুদামটি ছিল লক্ষ্মীপুরে পাকবাহিনীর প্রধান ঘাঁটি। জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতাকামী স্থানীয় বাঙ্গালীদের ধরে এনে এখানে অমানুষিক নির্যাতন করা হতো। শেষে এদেরকে সন্নিকটস্থ রহমতখালী খালের উপর মাদাম ব্রিজে গুলি করে হত্যা করে লাশ খালে ভাসিয়ে দেয়া হতো। বাগবাড়ির এই জায়গাটিকে বলা হয় টর্চার সেল। যুদ্ধশেষে এই টর্চার সেল গণকবর হিসেবে স্থাপিত হলেও তা সংরক্ষণ করা হয়নি। বরং ‘৭৫ পরবর্তী সময় সেখানে স্থাপন করা হয় গণশৌচাগার। এনিয়ে পুরো জেলায় সমালোচনার ঝড় ওঠলে পরবর্তীতে পৌর কর্তৃপক্ষ গণশৌচাগার ভেঙে স্থানটি বধ্যভূমি হিসেবে সংরক্ষণ করে।
এদিকে, জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিল সূত্রে জানা যায়, প্রতি বছরের মতো এবারও জেলা মুক্তিযোদ্ধা কামান্ড কাউন্সিল হানাদার মুক্ত দিবস পালনের উদ্যোগ নিয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে র‌্যালি ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে।

নিউজটি শেয়ার করুন:


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved © 2018 Priyo Upakul
Design & Developed BY N Host BD
error: Content is protected !!